শিরোনাম:

অশ্রু ও ক্ষোভ নিয়ে আজ মাঠে নামছেন মাশরাফিরা

বিডিকষ্ট ডেস্ক

 

চোখের ভেতর যে ভরা বর্ষার ঝিল ছিল, জানা ছিল না বুঝি মাশরাফির। নিজের অজান্তেই তাই গাল বেয়ে পড়ল একফোঁটা নোনা জল, ‘তাসকিন আছে’ বলতে পারার সময় পেরিয়ে সে যে কাল দাঁড়িয়ে ‘তাসকিন নেই’-এ! খোয়ানোর এ ব্যথা নিয়ে বুকের মধ্যে গোঙানো বিদ্রোহটা কীভাবে বাইরে বের করবেন তিনি, আইসিসির আইনি শাসনে হাত-পা না হয় বাঁধা; কিন্তু চোখ তো কারও শাসনে চলে না! তাই গতকাল ব্যাঙ্গালুরুর মিডিয়া রুমের বাইরে পরিচিত মুখগুলো দেখেই নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক। কেঁদে ফেললেন মাশরাফি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সুপার টেনের বাঁচা-মরার ম্যাচের আগে এ যেন অচেনা এক অধিনায়ক, বেদনা-জর্জর ক্ষোভ আর প্রতিকারবিহীন অসহায়ত্ব চারপাশ থেকে ছেঁকে ধরেছে তাকে! তাহলে কি মাঠে নামার আগেই হাত তুলে ফেললেন মাশরাফি? চোখ মুছেই চোয়াল শক্ত তার, ‘প্রথমত, আমরা মাঠে নামব জয়ের জন্য, যে-ই খেলুক, যা-ই খেলুক না কেন…।’ চোখভরা জল ও বুকভরা ক্ষোভ নিয়েই আজ মাঠে নামছেন মাশরাফিরা।

সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি বলে গেলেন, বিসিবি যেন এ ব্যাপারে কিছু একটা করে। ওদিকে ঢাকার খবর হলো, গতকাল সকালে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের বাসায় জরুরি বৈঠক ডেকে তাসকিনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার জন্য আইসিসি বরাবর আপিল করা হয়েছে। আইসিসিও এ বিষয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছে। বিসিবি সভাপতির ক্ষীণ আশা, তাসকিনকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াগুলো পুরোপুরি আইনসিদ্ধ হয়নি বলেই তাকে আবারও এই বিশ্বকাপেই খেলতে দেখা যেতে পারে। এ ব্যাপারে তিনি আইসিসি সভাপতি শশাঙ্ক মনোহরের সঙ্গেও টেলিফোনে কথা বলেছেন। আইসিসিও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

১৫ মার্চের পরীক্ষায় মাত্র তিন-চার মিনিটের মধ্যে তাসকিনকে ৯টি বাউন্সার দিতে বলা হয়। সেখানে নাকি ৩টি বাউন্সার অবৈধ ধরা পড়ে। অল্প সময়ে এতগুলো বাউন্সার দিতে হলে এ রকম হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। মূলত এ পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করেই তাসকিনের বোলিং নিষিদ্ধ করে আইসিসি। কিন্তু নিয়ম হলো, ম্যাচের যে ডেলিভারিতে অ্যাকশন সন্দেহজনক মনে হয়েছে, পরীক্ষায় সেটাই করতে বলা হবে বোলারকে। সে অনুযায়ী পরীক্ষায় তাসকিনকে বাউন্সার দিতে বলার কথা নয়। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে যে তিনি কোনো বাউন্সারই দেননি, বিসিবি সম্ভবত এ পয়েন্টটি তুলে ধরেই তার নিষেধাজ্ঞা স্থগিত চেয়েছে।

অধিনায়ক মাশরাফিও বুকে পাথরচাপা দিয়েই শিরদাঁড়া শক্ত করেছেন। জানিয়ে দিলেন, মুস্তাফিজ প্রস্তুত এ ম্যাচে নামতে। তাসকিনের বদলে হয়তো তাকেই নতুন বল সামলাতে হবে; কিন্তু ছয়-সাত মাস ধরে নতুন বল করতেন আল-আমিন আর তাসকিন। মুস্তাফিজকে একটু পরে আনা হতো। আরাফাত সানির শূন্যতাও থাকছে দলে। আগের রাতে কলকাতা থেকে এদিন সকালেই ব্যাঙ্গালুরুতে দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বাঁহাতি স্পিনার সাকলাইন সজীব। সজীব এবং শুভাগত- কাউকেই ঠিক আজকের ম্যাচে নামাতে চাচ্ছেন না কোচ হাথুরুসিংহে। সানির জায়গায় আজ দেখা যেতে পারে নাসির হোসেনকেই। এমনিতে র‌্যাংকিংয়ের বিচারে অস্ট্রেলিয়া বেশ এগিয়ে। তা ছাড়া প্রায় এক বছর ধরে এই দলটির সঙ্গে যেন দেখা হয় হয় করেও হচ্ছে না। গত বিশ্বকাপে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ম্যাচটি ভেস্তে গিয়েছিল বৃষ্টির কারণে। এরপর গত অক্টোবরে নিরাপত্তার অজুহাতে অসিরা আসেনি বাংলাদেশে। একটি দেখে নেওয়ার ব্যাপার তো থাকছেই অসিদের সঙ্গে! সংবাদ সম্মেলনে সেটা না বলুন মাশরাফি, টিম হোটেলের সান্ধ্য মিটিংয়ে অসি-বধের একটা ছক কষে রেখেছেন কোচ হাথুরুসিংহে। অস্ট্রেলিয়ার এই দলের অনেকেই একসময় হাথুরুসিংহের ছাত্র ছিলেন। অসি অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ তো নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে এই হাথুরুর হাতেই বড় হয়েছেন। গতকালও ব্যাঙ্গালুরুতে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আসতেই হাথুরুর কথা জানালেন স্মিথ, ‘হাথুরু খুব দারুণ কোচ। তিনি মস্তিষ্ক দিয়ে ম্যাচকে পড়ে থাকেন। তার মেধায় বাংলাদেশ দল দারুণ সাফল্য পাচ্ছে। সম্প্রতি তাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়নি, তবে কাল (আজ) আমি কঠিন লড়াই আশা করছি।’

সুপার টেনের প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে গিয়ে বেশ অস্বস্তিতে অস্ট্রেলিয়া। রান রেটে এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশের ওপরেই রয়েছে তারা। তবে নিউজিল্যান্ড টানা দুটো ম্যাচ জিতে যাওয়ায় ‘এ’ গ্রুপ থেকে আজকের ম্যাচ হেরে যাওয়া মানে অস্ট্রেলিয়া কিংবা বাংলাদেশ যে কোনো দলের সেমিফাইনালের স্বপ্ন প্রায় শেষ। তাই আজকের ম্যাচটির যথেষ্ট গুরুত্ব মাশরাফিদের কাছে। ব্যাঙ্গালুরুর চেন্নাস্বামী স্টেডিয়াম ভারতের অন্য যে কোনো মাঠের তুলনায় ছোট। এখানকার পিচ বরাবর বাউন্ডারির সীমানা বড়জোর ৬৮ গজ! অথচ সেটা ৭২ থেকে ৭৫ গজ পর্যন্ত হতে পারে। মাস তিনেক আগেই এই মাঠে ‘এ’ দলের হয়ে খেলে গেছেন সৌম্য, নাসির, আল-আমিনরা। কন্ডিশনের সঙ্গেও যথেষ্ট পরিচিত তারা। যদিও দিনে এ শহরের তাপমাত্রা ৩৮ ছাড়িয়ে যাচ্ছে কখনও কখনও। তবে আজকের ম্যাচটি শুরু হবে সন্ধ্যার পর, তাই শিশিরের একটি ব্যাপারও জড়িয়ে থাকছে।

বাংলাদেশ দলের কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে কোচ হাথুরু প্রতিপক্ষের সব তথ্য-উপাত্ত হাজির করেছেন মাশরাফিদের সামনে। অস্ট্রেলিয়ার এই দলের বোলিং অতটা আহামরি নয় বলেই মনে হয়েছে তাদের। নাথান কার্লটার, শেন ওয়াটসন আর জেমস ফকনার থাকছেন পেস অ্যাটাকে। আর গ্গ্নেন ম্যাক্সওয়েল থাকছেন স্পিন অ্যাটাকে। বোলিংয়ের শুরুতে ওয়াটসনকে আটকানোটাই হবে প্রথম চ্যালেঞ্জ। ওয়াটসন, স্মিথ, ওয়ার্নার, ম্যাক্সওয়েল- অসি দলের হার্ডহিটারদের অনেকেই আইপিএল খেলে থাকেন নিয়মিত। ব্যাঙ্গালুরুর এই ছোট মাঠে তাদের ছক্কা হাঁকানোর রেকর্ডও রয়েছে।

ম্যাচের আগে এসব তথ্য দিয়ে অবশ্য মাশরাফিদের ভেতরের জেদ থামানো সম্ভব নয়। টিম মিটিংয়ে মাশরাফি তার ব্যাটসম্যানদের কাছে একটি চাওয়া চেয়ে রেখেছেন- এই মাঠে তোমরা যদি ১৭০ থেকে ১৮০ করতে পারো, তাহলে আমরা বোলাররা অস্ট্রেলিয়াকে থামিয়ে দিতে পারব। এমনিতে দু’দলের তিনবারের মুখোমুখিতে প্রতিবারই হেরেছে বাংলাদেশ। তবে অনেকদিন হলো বদলে যাওয়া বাংলাদেশের এই দলটিকে দেখেনি স্টিভেন স্মিথের অস্ট্রেলিয়া। ব্যাটিংয়ে তামিম বেশ ফর্মে, সৌম্যর কাছ থেকেও কোচ আজ বিস্ফোরক এক ইনিংস চেয়ে রেখেছেন। সাবি্বর ব্যাঙ্গালুরুতে এসেই বাউন্ডারির সীমানা মেপে রেখেছেন। আজ রান চাই মুশফিকের ব্যাটে, সাকিবকেও আজ ঢিলেঢালা মেজাজের বাইরে এসে ব্যাট চালাতে হবে। আগের ম্যাচে ইডেনের পিচ দেখে ধোঁকা খাওয়ার পর ব্যাঙ্গালুুরুতে এসেই সতর্ক মাশরাফি-হাথুরু। দু’দিন ধরে এই মাঠ চষে বেরিয়ে কিউরেটরের কাছ থেকে যে তথ্য পেয়েছেন, তা অনেকটা এমন- ১৮০ না হলে যেন জয়ের চিন্তা কেউ না করে…। দুপুরে স্টেডিয়ামে দেখা মাশরাফিকে যথেষ্ট শোকাতুর মনে হয়েছে, তবে সন্ধ্যায় ব্যাঙ্গালুরুর টিম হোটেলের খবর- ওই দু’জনের জন্যই আজ কিছু একটা করে দেখানোর শপথ নিয়েছে গোটা দল।

তাসকিনকে খেলানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা বিসিবির : বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের আশা, বিশ্বকাপের পরের ম্যাচগুলোতে পাওয়া যাবে তাসকিনকে। তাসকিনকে ফিরে পেতে সাধারণ প্রক্রিয়ার বাইরেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বিসিবি। এ জন্য গতকাল সকালে নাজমুল হাসান প্রথমে ফোনে কথা বলেছেন আইসিসি চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর এবং আইসিসির প্রধান নির্বাহী ডেভ রিচার্ডসনের সঙ্গে। বিসিবি সভাপতি জানিয়েছেন, আইসিসিও বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বিসিবি সভাপতির ফোন পাওয়ার পরই তাসকিনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য আইনজীবী এবং বিশেষজ্ঞ নিয়ে বৈঠকে বসেছেন আইসিসির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী। অতি দ্রুত সন্তোষজনক জবাব আসবে বলেও আশা করছেন বিসিবি সভাপতি।

হঠাৎ করেই দুই বোলারের অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মতো বিসিবিও বিস্মিত এবং ক্ষুব্ধ। নাজমুল বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি বোলিং, এটা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তির ওপর আঘাত। এমন তো নয় যে, আমরা দু’জনকে নতুন নামিয়েছি। তারা নিয়মিত খেলছে। সেখানেও আইসিসির এই আম্পায়াররাই ছিলেন। এখন যেটা হলো সেটা আমাদের জন্য বড় ধাক্কা, আমরা এ সিদ্ধান্তে বিস্মিত।’ বিশেষ করে পেসার তাসকিনের ব্যাপারে আসা রিপোর্ট মেনে নিতে পারছে না নামুল, ‘তাসকিনের যে রিপোর্ট পেয়েছি সেটা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই। অত্যন্ত দুঃখজনক। এখন তাদের ফেরাতে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যা যা করা দরকার আমি করেছি। প্রধান দুই বোলার চলে গেলে আমরা বিশ্বকাপ কি খেলবো? এখন তো আমাদের না খেলার মতোই অবস্থা!

‘ তাসকিনের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের জন্য বিসিবি আপিল করলেও কোনো বোলারের অ্যাকশন অবৈধ ঘোষণার পর পুনরায় পরীক্ষা না দিয়ে মুক্ত হওয়ার কোনো নজির নেই। নিয়মানুযায়ী সাত দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ আছে তাসকিনের। বিসিবি অবশ্য এর আগেই এ পেসারকে পেতে মরিয়া, ‘আমরা কয়েকটা যুক্তি দেখিয়ে এ নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার কথা বলেছি। নিষেধাজ্ঞা আইসিসি আরোপ করে, তুলে নেওয়া ক্ষমতাও তাদেরই। তাই তাদের কাছে আপিল করেছি। কখনও সিদ্ধান্ত পাল্টে যাওয়া দেখিনি। তবে তাসকিনের ব্যাপারে সেটা হলে আমি অবাক হবো না, আমি আশাবাদী। সামান্যতম হলেও আগামী ম্যাচগুলোতে তাসকিনের খেলার একটা সম্ভাবনা আছে।’

এসব চিন্তা তাদের ওপর ছেড়ে দিয়ে মাঠে নিজেদের উজাড় করে দেওয়ার জন্য ক্রিকেটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নাজমুল হাসান, ‘বাংলাদেশ দলের প্রতি আমার একটাই বার্তা, খেলা ছাড়া তারা যেন অন্য কোনো দিকে মনোযোগ না দেয়। এখানে কোনো ব্যক্তি বড় কথা নয়। তাসকিন ইনজুরির জন্য অনেক দিন জাতীয় দলে খেলেননি। রুবেল নেই, মুস্তাফিজ ছিল না, তাই বলে কি আমরা বসে আছি! আমাদের সাহস আছে, আমরা লড়ব। ক্রিকেটাররা যেন শুধু খেলায় ফোকাস করে। এর বাইরে অন্য কিছু নিয়ে তাদের চিন্তা করা উচিত নয়। বাকি চিন্তা আমরা করব।’

বিসিবি জোর চেষ্টা চালালেও বিশ্বকাপে তাসকিনের খেলার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ স্বল্প সময়ে পুনরায় পরীক্ষা ছাড়া বোলিং নিষেধাজ্ঞা ওঠার নজির আছে মাত্র একটি। সেটাও ১১ দিন লেগেছিল। ১৯৯৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পেস বোলার শোয়েব আখতারের বোলিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের আপিলে ১১ দিনের মাথায় আইসিসি নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে খেলেছিলেন শোয়েব। বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ ২৬ মার্চ। বিসিবির আপিলে ৫ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা উঠলে সেটা হবে নতুন নজির।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: