শিরোনাম:

ডোনাল্ড ট্রাম্প রোপিত বিষবৃক্ষ

BDcost Desk:


মা র্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসীদের দেশ। ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে কলম্বাস কর্তৃক মূল আমেরিকা আবিষ্কারের পর চলছে অভিবাসীদের অভিযাত্রা। সপ্তদশ এবং অষ্টদশ শতাব্দীব্যাপী ব্রিটিশ প্রাধান্যে পরিপূর্ণতা অর্জন করে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে তারা অর্জন করে নতুন জাতিসত্তা। ইতিহাসের পথপরিক্রমায় নির্মিত হয়েছে অভিন্ন নাগরিক পরিচিতি। আজকের একক পরাশক্তি অভিবাসী আমেরিকার শ্রেষ্ঠ অর্জন। বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এস. পি হান্টিংটন (Samuel P. Huntington: 1927-2008) তাদের সেই জাতিসত্তা এবং অর্জন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি তার জীবনের শেষ গ্রন্থ ‘Who Are We? The Challenges to America’s National IdentityÕ (2004) নামক গবেষণা সমৃদ্ধ প্রকাশনায় তার ওই উৎকণ্ঠার কথা প্রকাশ করেন। তিনি ভবিষ্যৎ বার্তা প্রদান করেন যে, আগত ও সমাগত অভিবাসীদের প্লাবনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব জাতিসত্তা হারিয়ে ফেলবে। হান্টিংটন তার সভ্যতার দ্বন্দ্ব ((Clash of Civilizations) তত্ত্ব দ্বারা ইতিমধ্যে নন্দিত ও নিন্দিত হয়েছেন। এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদ প্রচারণার সুবাদে হান্টিংটন দ্বিতীয়বার আলোচনার শীর্ষে চলে এসেছেন। তার কারণ তিনি যা বলেছিলেন একযুগ আগে ২০০৪ সালে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন তা বলছেন। হান্টিংটন তত্ত্ব, তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করেছেন, হিস্পানিকরা তথা মেক্সিকো থেকে আগত অভিবাসীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমে ক্যালিফোর্নিয়া ঘিরে আর একটি হিস্পানিক আমেরিকা গড়ে তুলবে। বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া এ নিবন্ধে সম্ভব নয় এবং কাম্যও নয়। পাঠকসাধারণের অবগতির জন্য শুধু এতটুকু বলা যায় যে, গত ১২ বছরে অনেক ছোট ছোট হান্টিংটন রূপ, রস, গন্ধ দিয়ে হেমলকের পেয়ালা অনেক পরিপূর্ণ করে তুলেছেন। হিস্পানিক ইস্যুর সঙ্গে পরবর্তীকালে যুক্ত হয়েছে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ। এ রকম গবেষকের অভাব হচ্ছে না, যারা দূরবর্তীকালে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলছেন না। তারপর তো রয়েছে বিপদগামী মুসলমানদের জঙ্গি হামলা। সব মিলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে অনেক অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উপলক্ষে এত সব বাকবিতণ্ডার সূত্রপাত।

উল্লেখ্য, মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী একটি বিধিবদ্ধ সময়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য বারাক ওবামা নির্বাচিত হন। একজন ব্যক্তি যাতে ক্ষমতার সর্বেসর্বা হয়ে না ওঠেন, সে জন্য মার্কিন সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী একজন প্রেসিডেন্ট দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকতে পারেন না। আগামী ৪ নভেম্বর, ২০১৬ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য মার্কিন জনগণ ভোট প্রদান করবেন। নির্বাচন প্রক্রিয়া পরোক্ষ এবং জটিল। দলীয় মনোনয়ন পাওয়াও সহজসাধ্য নয়। যা হোক দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি প্রধান দল_ ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান পার্টি তাদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছে। সাবেক ফার্সদ্ব লেডি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী (Secretary of State) হিলারি ক্লিনটন ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী নির্বাচিত হন। অন্যদিকে রিপাবলিকান দল চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাদের প্রার্থী মনোনায়ন করে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রিপাবলিকান মনোনয়ন নিশ্চিত করতে সাত ঘাটের পানি খেতে হয়। প্রথম দিকে ট্রাম্পের অর্থবিত্ত এবং উল্টাপাল্টা কথাবার্তা আমুদে মার্কিনিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সুশীল প্রার্থীরা ট্রাম্পের মাস্তান চরিত্রের কাছে পরাজিত হন। সম্ভবত রিপাবলিকান শিবিরে যথাযথ প্রার্থীর অনুপস্থিতি ট্রাম্পের কপাল খুলে দেয়। যতই দিন যেতে থাকে, ততই ট্রাম্প মারমুখো হয়ে ওঠে। অভিবাসী দ্বারা ত্যক্তবিরক্ত মার্কিন জনগণের এক অংশ ট্রাম্পের কথায় সমর্থন জোগায়। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প যখন হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ান, তখন উগ্র মার্কিনিরা তাকে সাহস প্রদান করেন। ট্রাম্প যখন মার্কিনিদের পুঁজিকে সুউচ্চে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন তিনি প্রকারান্তরে করপোরেট হাউসের প্রতিনিধিত্বের কথা বলেন। ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী ইহুদি লবি এবং চরমপন্থি খ্রিস্টানরা একাট্টা হয়ে ট্রাম্পের বিজয়কে নিশ্চিত করে তুলতে চায়। এতদসত্ত্বেও তার মনোনয়ন এক সময় অসম্ভব মনে হয়। কিন্তু স্বার্থবুদ্ধি, উগ্রতা, হিংসা-প্রতিহিংসার মতো মানবিক দোষাবলি মানুষকে সহজে আন্দোলিত করে। বিবেক, বুদ্ধি ও বিবেচনার গতি ধীর। কিন্তু সহিংসতার গতি দ্রুত। যে কোনো একটি স্পর্শকাতর বিষয় মানুষকে অন্ধভাবে তাড়িত করে। এভাবেই ইতিহাসের চরম নির্মম অধ্যায়গুলো রচিত হয়েছে। ট্রাম্পের দেড় বছরব্যাপী প্রচারণা-পর্যালোচনা করলে দায়িত্বশীলতার পরিবর্তে সমাজকে বিষিয়ে দেওয়ার প্রবণতাই চোখে পড়বে।

যেসব বিষয় ট্রাম্প মার্কিন জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন, সেসব বিষয়গুলো হচ্ছে_ ১. অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন। মেক্সিকানদের বিরুদ্ধে তার সবচেয়ে বড় অভিযোগ। তিনি দাবি করেছেন, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টকে অভিন্ন সীমান্তে দেয়াল তুলতে তিনি রাজি করিয়েছেন। তাও আবার মেক্সিকোর নিজস্ব অর্থায়নে। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট তা অস্বীকার করেছেন। উল্লেখ্য, হিস্পানিক বলে কথিত মূলত মেক্সিকো থেকে আগত এই জনসংখ্যা এখন এক কোটিরও বেশি; ২. মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার। তিনি বলেছেন, কোনো মুসলিমকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেবেন না। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের জন্য তিনি মুসলিম সম্প্রদায়কে এককভাবে দায়ী করেছেন; ৩. আইএসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি। সিরিয়া ও ইরাকে উত্থিত ইসলামিক স্টেট-আইএসের জন্য তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি ক্লিনটনকে দায়ী করেছেন; ৪. তিনি বিশ্বব্যাপী মুক্তবাজার অর্থনীতির বদলে মার্কিন ব্যবসাবান্ধব একক বাণিজ্যনীতি প্রবর্তন করতে চান। মার্কিন ব্যবসায়ী ব্যতীত অন্য কাউকে আমদানি-রফতানি শুল্ক সুবিধা দিতে চান না তিনি; ৫. বিদেশি মিত্র বা মার্কিন প্রভাববলয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিপুল সামরিক ব্যয়ের বিরোধিতা করছেন তিনি। এমনকি তিনি ন্যাটো জোটের বিলোপ চান; ৬. তিনি মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। এসব বক্তব্য বর্ণবাদকে উস্কে দেওয়ার শামিল বলে নাগরিকসাধারণ মনে করে। বর্তমান সময়ে গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গবিরোধী সহিংসতা ক্রমবর্ধমান। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের উক্তি আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতো বলে বিবেচিত হচ্ছে; ৭. তিনি নারীদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করে থাকেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যদিও রিপাবলিকান শীর্ষ উপদেষ্টাদের চাপে ওইসব প্রতিটি বিষয়ে তিনি নমনীয় মন্তব্য করেছেন; কিন্তু সে নমনীয়তা অব্যাহত থাকেনি। উল্টাপাল্টা মন্তব্য করে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। যখন তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে চরমপন্থার কথা বলছিলেন, তখন উপস্থিত বিপুল রিপাবলিকান সমর্থকরা তা গ্রহণ করে; ৮. ট্রাম্প নৈতিকভাবে খুবই দুর্বল ব্যক্তি। তিনি ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত। অনৈতিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন তিনি। মিথ্যা বলেন অনায়াসে। প্রেসিডেন্ট ওবামার জন্মস্থান নিয়ে তার মিথ্যাচার প্রমাণিত হয়েছে; ৯. প্রতিটি সমাবেশে এবং প্রথম বিতর্কে তার বক্তব্য ছিল অগোছালো এবং তথ্যবিহীন। এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তার অসহিষ্ণু ও দাম্ভিক চরিত্রের প্রমাণ মেলে; ১০. তার রাজনৈতিক ডিগবাজি ইতিমধ্যে হাস্যরসের কারণ হয়েছে। কখন যে তিনি কী বলেন, তার ঠিক নেই। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নীতিমালার ক্ষেত্রে অসংলগ্নতার প্রমাণ মিলেছে। অভিজ্ঞ মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মার্কিন জনমতকে তেতিয়ে দেওয়ার জন্য নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের পেছনের শক্তিগুলো আরও বোমাবাজি ও সহিংসতা ঘটাতে পারে।

ট্রাম্পের যে ১০ দফা নীতি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেল তা বাস্তবায়িত হলে আমেরিকা আর আমেরিকা থাকবে না। তা হয়ে উঠবে মেক্সিকো কিংবা বলিভিয়া। তবে আশ্বস্ত হওয়ার বিষয় এই, মার্কিন জনগণ যে উদারতায় একজন কৃষ্ণাঙ্গকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছে, সে মনোভাবের ওপর বিশ্ববাসীর এখনও ভরসা রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় ক্ষুব্ধ মার্কিন জনগণের সংবেদনশীল মনোস্তত্ত্বে আঘাত করেছেন। অভিবাসীর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সন্দেহ নেই, আজ অভিবাসী সমস্যা রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত রাষ্ট্রীয় নীতি এবং জনসংস্কৃতি অভিবাসীদের ধারণ করতে সক্ষম। এক সময় কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী বিরোধ, বিদ্রোহ এবং বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়েছে। এখন তারা মার্কিন জনমণ্ডলীতে আত্মস্থ হয়েছে। বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করেছে। পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজির সর্বময়তা প্রকাশ পেয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দম্ভে। এই বাস্তবতার বিপরীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প। সব ধর্মের যে সহমত ও সহাবস্থান রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প শুধু ক্ষমতার জন্য সেখানে আগুনের ফুলকি সৃষ্টি করেছেন। কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের মাঝে অনেক দিনের যে ক্ষত প্রশমিত হয়ে আসছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই ক্ষত উস্কে দিয়েছেন। হয়তোবা এবার মার্কিন জনগণের উদারতা, মহানুভবতা এবং সৎ গুণাবলির কারণে ট্রাম্পের মতো বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী এবং চরমপন্থি ব্যক্তিত্ব পরাজিত হবে। কিন্তু তিনি জনসমাজে যে ঘৃণা, বিভেদ এবং বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ রচনা করলেন, একদিন তা ফুল ও ফলে কুশোভিত হয়ে গোটা মার্কিন ব্যবস্থাকে বিষাতুর করে তুলবে। এই মুহূর্তে সেই বিষের প্রকোপ অনুভূত হচ্ছে না। কিন্তু সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এই বিষক্রিয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রটি ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ২০২০ কিংবা ২০২৪ সালের নির্বাচনে সৃষ্ট বিষক্রিয়া অনুভূত হবে। আর একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প হিংসার ট্রাম্প কার্ড ব্যাবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের মালিক-মোক্তার হয়ে বসবেন। ট্রাম্পের মতো মানুষ ক্ষমতাকেই চিন্তা করে, রাষ্ট্রকে নয়। আর একজন রাষ্ট্রনায়ক রাষ্ট্রকে চিন্তা করে, ক্ষমতাকে নয়। James Freeman Clarke কথিত ইংরেজি প্রবাদটা এ রকম, ÔA politician thinks of the next election. A statesman, of the next generation.Õ


বিঃ দ্রঃ জাতীয়, আন্তর্জাতিক, লাইফস্টাইল, শিক্ষা, টেকনোলজি, খেলাধুলা, বিনোদন, ইত্যাদি। বাংলা নিউজ রেগুলার আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বিডিকষ্ট্

,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: