শিরোনাম:

দুর্নীতি ব্যাপক, জবাবদিহি নেই

BDcost Desk:


দেশের তরুণেরা মনে করেন, সরকারের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব বা দুর্নীতিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এর বাইরে দেশের আরও দুটি বড় সমস্যা আছে। যেমন রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব এবং সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ঘাটতি।
বাংলাদেশের তরুণদের কাছে মূলত জানতে চাওয়া হয়েছিল, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোন তিনটি? বাংলাদেশের তিন সমস্যা জানার পর পরের প্রশ্নটি ছিল, বিশ্বের প্রধান তিন সমস্যা তাহলে কী? বাংলাদেশের তরুণেরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ধর্মীয় সংঘাত ও বড় আকারের সংঘাত বা যুদ্ধ।

সারা বিশ্বের তরুণদের নিয়ে এই জরিপ করেছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বা ডব্লিউইএফ)। ভবিষ্যতের পৃথিবীকে যাঁরা বদলে দেবেন, তাঁদের চাওয়া-পাওয়া জানতেই জরিপটি করা হয়। ৯ নভেম্বর বিশ্বব্যাপী ‘গ্লোবাল শেপার্স সার্ভে-২০১৬’ শীর্ষক জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেন বিশ্বের ১৮৭টি দেশের ২৬ হাজার ৬১৫ তরুণ। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের ছিলেন ৬৭২ জন। জরিপে বৈশ্বিক ফলাফল বিশ্লেষণ ছাড়াও প্রতিটি দেশ নিয়ে আলাদাভাবে তরুণদের মতামতগুলো প্রকাশ করা হয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া সবার বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। বিশ্বব্যাপী এই বয়সের তরুণদের সহস্রাব্দের প্রজন্ম বা ‘মিলেনিয়াল জেনারেশন’ বলা হয়। মোট উত্তরদাতাদের মধ্যে ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সী উত্তরদাতা ১৭৫ জন, ২২ থেকে ২৬ বছর বয়সী ৩৩৬ জন, ২৭ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১২৮ জন আর ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ছিলেন ৩৩ জন। তাঁদের মধ্যে নারী উত্তরদাতা ২৭৭ আর পুরুষ উত্তরদাতা ছিলেন ৩৯৪ জন। তাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, মূল্যবোধ, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে নিজেদের মতামত দিয়েছেন।

তরুণদের মতামত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা দুর্নীতিকেই বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা বলে একাধিকবার মতামত দিয়েছেন। কেবল বাংলাদেশই নয়, বৈশ্বিক ফলাফলও এক। যেমন সারা বিশ্বের তরুণদের ৫৭ শতাংশের মতে, দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাবই বিশ্বব্যাপী প্রধান সমস্যা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল জরিপটি নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী দায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাঁরা ক্ষমতাকে দায়িত্ব মনে না করে, সুযোগ-সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে যে ব্যবহার করছেন, তরুণেরা তা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে তরুণদের এ মতামতকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে তরুণেরা দেশ ছাড়বেন, বিপথগামী হবেন। সেটা যাতে না ঘটে, তেমন মানসম্পন্ন ব্যবস্থা সরকারকে অবশ্যই তৈরি করতে হবে।

ক্ষমতার অপব্যবহারে হতাশ: জরিপে রাজনীতি নিয়ে তরুণদের কাছে করা খুব সুনির্দিষ্ট দুটি প্রশ্ন করা হয়েছিল। প্রথমটি হচ্ছে, দেশের নেতৃত্বের (যেমন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, মেয়র ইত্যাদি) কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি হতাশ করে? প্রায় ৭৬ শতাংশ তরুণই বলেছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি তাঁদের সবচেয়ে বেশি হতাশ করে। আরও হতাশাজনক হচ্ছে নেতাদের স্বচ্ছতার অভাব। এ ছাড়া ৩৯ শতাংশ তরুণ মনে করেন, নেতাদের মধ্যে আছে অসততা ও আন্তরিকতার ঘাটতি।

রাজনীতি বিষয়ে এ প্রশ্নের উত্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সাধারণ জনগণের মনোভাব বুঝতে পারার ব্যর্থতার কথাও বলেছেন বাংলাদেশের তরুণেরা। এর বাইরে সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া, অনড় মনোভাব, প্রভাবশালীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া, সেকেলে চিন্তাভাবনাকেও বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেছেন তাঁরা।
বারবারই স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিকে সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে করার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন করা হয়, সরকার কী কী উপায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দেখাতে পারে? ৬২ শতাংশ বাংলাদেশি তরুণ বলেছেন, সরকারের যাদের মধ্যে সুশাসনের ঘাটতি দেখা দেবে, তাদের দৃশ্যমান শাস্তি দিতে হবে। ৪৭ শতাংশের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ৩৮ শতাংশের মতে, সরকারের সমালোচনা করতে দিতে হবে, বিক্ষোভ দেখানোর সুযোগ রাখতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রথম আলোকে বলেন, তরুণেরা যেসব সমস্যাকে চিহ্নিত করেছেন, সেগুলোর সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ খুব কম। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, দেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি তরুণেরা একধরনের নেতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন। বাংলাদেশ যে ক্রমান্বয়ে একটি গুরুতর অসম সমাজে পরিণত হচ্ছে, সেটিও তরুণেরা সঠিকভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁদের সক্ষমতা ও সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তরুণেরা একটি প্রতিবন্ধকতা মনে করছেন, যা একটি গুরুতর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বকে লালন করছে। এটিকে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিচক্ষণতার সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

দুর্নীতি বৈষম্য বাড়াচ্ছে: বাংলাদেশের তরুণদের কাছে আরেকটি প্রশ্ন ছিল, কোন বিষয়গুলো দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য বাড়াচ্ছে? এর উত্তরে আবারও তাঁরা বলেছেন দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাবের কথা (৬৫ শতাংশ)। এ ছাড়া ৪৮ শতাংশের মতে, এখানে ভালো মানের শিক্ষার সুযোগ সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না, যা বৈষম্য বাড়াচ্ছে। আরও আছে রাজনৈতিক মতপার্থক্য।
তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান তৈরিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো কী? এর উত্তরে ৫০ শতাংশ তরুণ নতুন উদ্যোগ বা ‘স্টার্ট আপ’কে তাঁদের কর্মসংস্থানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মত দিয়েছেন। ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন ৪৫ শতাংশ তরুণ। আর ৪২ শতাংশ তরুণ মুক্ত গণমাধ্যম অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে তাঁদের কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি নাসিম মঞ্জুর প্রথম আলোকে বলেন, এই গবেষণা প্রমাণ করে, রাজনীতি ও অর্থনীতি আলাদা কোনো বিষয় নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক অগ্রগতিও এ দেশের তরুণদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রে সুশাসনের চাহিদার বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে। সুশাসন নিশ্চিতে রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভকে সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রযুক্তিকে স্বাগত: তরুণদের কাছে প্রথম প্রশ্ন ছিল, আগামী ১০ বছরে প্রযুক্তিগত যেসব পরিবর্তন আসবে, এর ফলে জীবনের কোন দিকটি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে? এর উত্তরে ৬৬ শতাংশ তরুণ বলেছেন, চাকরি বা পেশাজীবনে প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে। শিক্ষা লাভের পদ্ধতিতেও প্রযুক্তির কারণে অনেক বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন ৬০ শতাংশ তরুণ। প্রযুক্তির কারণে যোগাযোগমাধ্যম অনেক বেশি পরিবর্তিত হবে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। এ ছাড়া জীবনধারা, কেনাকাটা, অবসর সময় কাটানো, বাসস্থান, খাদ্য, বিয়ের মতো বিষয়ে প্রযুক্তির বড় প্রভাব ফেলার কথা বলেছেন তরুণেরা।
তরুণেরা আরও মনে করেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে স্বাস্থ্য খাত। এ ছাড়া শিক্ষা, কৃষি, সরকারি কাজকর্ম, অবকাঠামো উন্নয়ন খাতও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে লাভবান হবে বলে তরুণেরা মনে করেন।

প্রয়োজন কর্মসংস্থান: ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবন বা কর্মসংস্থানে কোন তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? এ প্রশ্ন করা হলে ৫৫ শতাংশ তরুণ বলেছেন, বেতন বা আর্থিক প্রাপ্তি পেশাগত জীবনে তাঁদের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ৪১ শতাংশ তরুণ পেশাগত উন্নতিকে এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে মত দিয়েছেন। আবার একজন তরুণের কাজ সমাজে কী প্রভাব রাখছে, সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন ৩৩ শতাংশ তরুণ। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের মধ্যে সমন্বয় করা, কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা, সহকর্মী বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, সামাজিক সম্মান, বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ ও প্রশিক্ষণের সুযোগকে পেশাগত জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এ দেশের তরুণেরা।

মূল্যবোধ: জানতে চাওয়া হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় আদর্শ বা মতামত রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচার পাওয়া কতটুকু যুক্তিসংগত? এর উত্তরে ২৬ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রচারণা করা কোনোভাবেই উচিত নয়। ২২ শতাংশ তরুণ এমন প্রচারণা করা ঠিক নয় বলে জানিয়েছেন। এর বিপরীতে ২৭ শতাংশ তরুণ একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রীয় প্রচার দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। ২৪ শতাংশ তরুণ এই প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, পক্ষে-বিপক্ষে কোনো কাজই করা ঠিক নয়।

সবশেষে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এ গবেষণায় যাঁরা মতামত দিয়েছেন, তাঁরা বাংলাদেশের সচেতন ও শিক্ষিত তরুণ। স্বাভাবিকভাবে তাঁরা আগামী দিনের বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করবেন। তাই তাঁদের মতামতকে অবশ্যই গুরুত্বসহকারে নিতে হবে। এমনিতেই বাংলাদেশের তরুণ সমাজের একটি সাধারণ ধারণা হলো, চলমান রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও সামাজিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে তাঁদের মতামত অন্তর্ভুক্ত হয় না। নীতিনির্ধারণে তরুণদের মতামত প্রকাশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকর কাঠামো নেই। সে জন্য এই মতামতকে একটা সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।’

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) হলো সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতির মতো বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করা হয় ডব্লিউইএফকে। প্রতিবছর তাদের বার্ষিক সভায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতারা অংশ নেন। এটিকেই সরকারি-বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় সভা হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১৫ সালে তরুণদের নিয়ে ছোট আকারে একটি জরিপ করা হয়েছিল। তবে সেখানে আলাদা করে কোনো দেশকে নিয়ে মতামত দেওয়া ছিল না।


বিঃ দ্রঃ জাতীয়, আন্তর্জাতিক, লাইফস্টাইল, শিক্ষা, টেকনোলজি, খেলাধুলা, বিনোদন, ইত্যাদি। বাংলা নিউজ রেগুলার আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বিডিকষ্ট্

,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Anti-Spam Quiz: